তারাপীঠ সাধনক্ষেত্র ভ্রমণ – তন্ত্র সাধনায় তারাপীঠের গুরুত্ব অপরিসীম। তারাপীঠ একাধারে বাংলার তন্ত্র সাধনার প্রান কেন্দ্র। বশিষ্ঠমুনির সিদ্ধি লাভের স্থান আবার বামাখেপার লীলা ক্ষেত্র। সাধক বামাখ্যাপার সাধনস্থল হিসেবে খ্যাত অন্যতম প্রসিদ্ধ শক্তিপীঠ এই তারা মায়ের মন্দির।
তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী তারা মা’কে বলা হয়েছে দ্বিতীয় মহাবিদ্যা। তারাপীঠ শ্মশান তন্ত্র সাধনার এক উৎকৃষ্ট স্থান কারন এটি কোনো সাধারণ শ্মশান নয়, এটি মহাশ্মশান। এই মহাশ্মশানেই জীবন আর মৃত্যুর পটভূমি নিত্য রচনা করে চলেন দেবী মা তারা। মাতারা এই মহাশ্মশানে জ্যোতিরূপে বাস করেন। কিংবদন্তী অনুসারে দ্বারকা নদী মহাশক্তির উৎস। এই নদীজলে স্নান করলেই সিদ্ধিলাভের যোগ্যতা অর্জন করেন সাধারন থেকে অতিসাধারন মানুষ। নাশ হয় সব রকমের পাপ। আশ্চর্যজনক ভাবে হোক আর অন্যকিছুর কারনে হোক এই নদী উত্তরমুখী। যে এই ক্ষেত্রটি তৈরি করেছিলেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই পীঠস্থানটি।
আবার তারাপীঠের পঞ্চমুন্ডীর আসন ও জগৎ প্রসিদ্ধ। এই পঞ্চমুণ্ডের আসন একটি আশ্চর্যের স্থান। যিনি দেবতাদের আশীর্বাদ প্রাপ্ত মহাশক্তিধর, শুদ্ধচিত্ত, ভক্তিপরায়ণ, একাগ্রচিত্তে, যিনি শিদ্ধিলাভ করেছেন। যিনি মা তারাকে সন্তুষ্টু করেতে পেরেছেন এমন ব্যক্তিই এই আসনে বসে তপস্যা করতে পারেন। এই আসনে মধ্যে আছে পাঁচটি মুণ্ড সাপের, ব্যাঙের, খরগোশের, শিয়ালের এবং মানুষের। এই আসনে বসেই মা তারাকে তুষ্ট করে তারাপীঠকে সিদ্ধপীঠে পরিণত করেছিলেন। ঋষি বশিষ্ঠও পরবর্তী কালে সাধক বামাক্ষেপা।
তারাপীঠ সাধনক্ষেত্র ভ্রমণ
মাতারার মুল প্রস্তর নির্মিত মূর্তিটি রয়েছে একটি ধাতব মূর্তির অভ্যন্তরে। এই মূর্তিটি ভীষণা চতুর্ভূজা, মুণ্ডমালাধারিণী এবং লোলজিহ্বা মূর্তি। এলোকেশী দেবীর মস্তকে রয়েছে একটি রৌপ্যমুকুট। বহির্মূর্তিটি সাধারণ শাড়ি – জড়ানো অবস্থায় গাঁদা ফুলের মালায় ঢাকা অবস্থায় থাকে। মূর্তিটির মাথার উপরে একটি রূপোর ছাতা। প্রতিকৃতি বিগ্রহের নিচে গোলাকার বেদীতে দুটি রূপোর পাদপদ্ম থাকে। যারা তারাপীঠ মন্দির ও দেবীকে দর্শন করেছেন তারা জানেন, উত্তরমুখী আটচালা মন্দিরটি লাল ইঁটে নির্মিত । এই মন্দিরের চূড়ায় একটি তামার পতাকাসহ ত্রিশূল তিনটি পদ্ম ভেদ করে উঠেছে। প্রাচীন কালে বণিক জয় দত্তের তৈরি করে দেওয়া তারামায়ের মন্দিরটি আজ আর নেই। বর্তমানের মন্দিরটি ১২২৫ বঙ্গাব্দে তৈরি করেন মল্লারপুরের জগন্নাথ রায়। দেবী সতীর চোখের ঊর্ধ্বনেত্রের মণি অর্থাৎ চোখের তারা এখানে পড়ায় দ্বারকা নদীর পুর্ব পাড়ের চণ্ডীপুর আজ তারাপীঠ।
কিছু সমাজে বজ্জাত নিন্দুক লোক আছে ভারতীয় যে কোন তারাপীঠ সিদ্ধ পিঠ হোক, মঠ মিশন, মন্দির – তির্থস্থান, জন্মস্থান থাকুক তার উপর প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি করাই তাদের কাজ। তাদেরকে যতই প্রমান দেওয়া হোক না কেন, এটা ভারতীয় অতিহ্য মণ্ডিত সিদ্ধ পিঠ, যতই বলা হোক তার বিভিন্ন বই, দার্শনিক, আরকিওলজি – রা প্রমান করেছেন যে এখানেই তারাপীঠ। তবু তারা বিশ্বাস করবে না। তারা বলবে এক মুসলিম সৃস্টি করেছে বা এটা মুসলিমদের স্থান। না হলে এটা ভাওতাবাজি ভারতীয় মানুষের, কুৎসা ছড়াবে ভারতীয় মানুষের মনের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস আচ্ছন্ন হয়ে ভুল বকছে। না হলে অন্য কিছু।
তারাপীঠ সাধনক্ষেত্র ভ্রমণ
এই তারাপীঠ না কেবল মাত্র একটি জাগ্রত শক্তিপীঠ বা উপপীঠ এ নিয়ে বিতর্ক ও মতান্তর বহু যুগ ধরে চলে আসছে। কথিত আছে বশিষ্টদেব সাধনা করতেন কামাখ্যায়। কিন্তু কোনো কারনে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি কামাখ্যা ত্যাগ করেন ও বাংলার বীরভূমের এই বিশেষ স্থানে এসে পঞ্চমুন্ডীর আসন প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী উগ্র তারার মুর্তি স্থাপন করে সাধনা শুরু করেন ও সিদ্ধি লাভ করেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই স্থান মাহাত্ম লোক মুখে প্রচারিত হয় ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তারাপীঠ।
পরবর্তী কালে আরেক মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে এই মহাতীর্থে, তিনি সিদ্ধ পুরুষ সাধক বামাক্ষেপা। সাধক বামাক্ষেপাও তারাপীঠে পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসে সিদ্ধি লাভ করেন ও দেবীর দর্শন লাভ করেন। সেই পরম্পরা চলেছে বহু যুগ ধরে একাধিক তান্ত্রিক সাধক ও মাতৃ সাধকের সাধনার প্রধান কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে তারাপীঠ। হয়ে উঠেছে দেশের আধ্যাত্মিক সাধনা ও বিশেষত তন্ত্র সাধনার অন্যতম প্রান কেন্দ্র। লালমাটির দেশ বীরভূমে অবস্থিত তারাপীঠের পরিবেশ ও অতি মনোরম ও তন্ত্রসাধনার আদর্শ স্থান। এখানে রয়েছে মন্দির সংলগ্ন মহাশ্মশান ও অদূরেই অতি পবিত্র দ্বারকা নদী। কিছু দুরে আটলা গ্রামে বামদেবের জন্মভিটেও একটি দর্শনীয় স্থান।
তারাপীঠ সাধনক্ষেত্র ভ্রমণ
লকডাউনে এই তির্থস্থান তারাপীঠ মন্দির তিন মাস বন্ধ ছিলো। লকডাউন খোলার পর আবার ভক্তদের আসা শুরু হয়েগেছে। ভক্তদের অনেকেরই মতে অনেক দিন পর তারাপীঠ দর্শন করে আনন্দ ও উৎসাহ ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না। আরও বলেন, মাতারার দর্শন লাভ করে ধন্য হই। তবে যতবারই আসি নতুন করে রোমাঞ্চ অনুভব করি, মুগ্ধ হই তারাপীঠে। রামপুরহাট স্টেশন থেকে মাত্র ৯ কিমি দূরে তারাপীঠ। যাচ্ছে অটো, রিকশ প্রভৃতি। এখানে রান্না করে খাওয়ার জন্য অনেক হােটেলে ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। হাওড়া রামপুরহাট ট্রেনে সন্ধ্যায় ৭.৩০ ছাড়ে।
আরও পড়ুনঃ
- কারক ও বিভক্তি কাকে বলে? | শিক্ষা – Madhyamik 2023
- পিএস ভোপাল যেটির পরিবর্তিত নাম বেঙ্গল প্যাডেল, এখন পর্যটনক্ষেত্র
- উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় কেশর চাষে সফলতা পেলেন বিজ্ঞানীরা
- ভারতের মন্দির – জ্বালামুখী (Jawalamukhi)
- অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র আদিনা মসজিদ
- বর্ধমানের বোর হাটের সাধক কমলাকান্তের কালীবাড়ি
- অশােকস্তম্ভ – এর ইতিহাস
- পদান্বয়ী অব্যয় কাকে বলে?
- Number: – Types, Rules & Examples (English Grammar) বাংলায় বচন কি, কত প্রকার
- Pronoun (সর্বনাম) কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? উদাহরণ দাও
